We currently don't have news in this language. Please choose another language.
সর্বস্তরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ
অর্ণব সাহা
৪ মে, ২০২৬। বিকেলের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত রাস্তার সিগন্যালের রঙ গেরুয়া। ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভারতীয় জনসঙ্ঘ’। ১৯৫২-র প্রথম সাধারণ নির্বাচনে সেই দল পশ্চিমবঙ্গে দুটি লোকসভা আসন পায়। স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদ জেতেন দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্র থেকে। দীর্ঘ সাতদশকের খরা কাটিয়ে সেই দলের উত্তরসূরি ভারতীয় জনতা পার্টি একক ক্ষমতায় সরকারে এল এইবার। যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেককেই বিস্মিত করেছে।
কিন্তু বিস্মিত হবার খুব একটা কারণ নেই। ২০১৯-এর লোকসভায় ১৮ টা আসন পেয়ে বিজেপি বুঝিয়ে দিয়েছিল, তারা বাংলার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের মন দখল করে ফেলেছে। এবার তারা পেয়েছে ৪৫.২ শতাংশ ভোট। তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট নেমে গিয়েছে ৪০.২ শতাংশে। সংখ্যার ফারাক ৩২ লক্ষ হলেও আসনের বিচারে তা গোটা ফলাফলকেই ওলটপালট করে দিয়েছে ! সমাজের সর্বস্তরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বারুদে অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ না ঘটলে এরকম ফলাফল হওয়া সম্ভব নয়।

চারটি ক্ষেত্র নিয়ে দু’চার কথা বলা যায়। প্রথমত, শিক্ষাক্ষেত্র। পরিসংখ্যান বলছে, তৃণমূলের পনেরো বছরে প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর অব্দি শিক্ষাক্ষেত্র সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে স্কুলের মোট সংখ্যা ছিল ৫০ হাজারের সামান্য বেশি। আজ তার সংখ্যা ৮২ হাজার। বহু প্রাইমারি স্কুলকে আপার প্রাইমারি, মাধ্যমিক স্কুলকে উচ্চমাধ্যমিক স্কুলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। তৈরি হয়েছে বেশ কিছু সরকারি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল। সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত কলেজের সংখ্যা শতাধিক বেড়ে হয়েছে ৪৩২। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৬ টি, যদিও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বৃহদংশের এখনও অব্দি স্থায়ী পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। স্থায়ী নিয়োগ হয়নি। গেস্ট ফ্যাকাল্টি দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে !
কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্র সম্প্রসারণের ফলে এক বিরাটসংখ্যক উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ের সংগঠিত বাহিনী তৈরি হয়েছে। মাস্টারডিগ্রি ও পিএইচডির সংখ্যাও বিপুল হারে বেড়েছে। কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণা শেষ হবার পরে তাঁরা উপযুক্ত চাকরি পাচ্ছেন না। ওই পরিমাণ সরকারি শিক্ষাক্ষেত্রের জন্য পর্যাপ্ত টাকা নেই যা দিয়ে এই বিপুল শিক্ষিত বেকারদের নিযুক্ত করা যায়। তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার এর পাশাপাশি বেসরকারি শিক্ষাক্ষেত্রকেও উপযুক্ত পরিকাঠামো দিয়ে উৎসাহিত করলে এদের একটা বড়ো অংশকে সেখানে নিয়োগপত্র দেওয়া যেত।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি। সমাজের সমস্ত ক্ষেত্রে আর্থিক দুর্নীতিকে ‘নরমালাইজ’ করেছে এই সরকার। বিশেষত, শিক্ষাক্ষেত্রে ২০১৪-র শেষদিক থেকে যে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম হয়েছে, তা এই সরকারের আমলে প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অব্দি এক লক্ষ সতেরো হাজার নিয়োগের সাফল্যকে চরম কালিমালিপ্ত করেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ, স্কুল সার্ভিস কমিশনে ২০১৬ সালের নিয়োগের ক্ষেত্রে এক অস্বাভাবিক দুর্নীতি, যে কারণে সুপ্রিম কোর্ট ২৬০০০-এর পুরো প্যানেল বাতিল করার নির্দেশ দেয়। যদিও একটা সেগ্রিগেশন তাদের ক্ষেত্রে করা গেছে। যোগ্য ৮,০০০। অযোগ্য ১৮,০০০। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের রায়ে অনড় থেকেছে। বাঙালির মতো শিক্ষা-সংস্কৃতিতে এগিয়ে থাকা জাতির কাছে এই ঘটনা প্রায় আগ্নেয় গোলার মতো আঘাত হেনেছে। কারণ এটি নজিরবিহীন।
একইভাবে নারী-নিরাপত্তায় গোটা ভারতে উপরদিকে থাকা সত্ত্বেও ৯ আগস্ট ২০২৪, আরজি কর হাসপাতালে ডাক্তারি ছাত্রীর নৃশংস খুন গোটা জনসমাজকে প্রায় আগ্নেয়গিরির উপরে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তৎক্ষণাৎ এর প্রভাব বোঝা না গেলেও জনসমাজে এই ঘটনার অভিঘাত যে একেবারে উপর থেকে নীচ অব্দি তিলে তিলে পড়েছে, তার প্রমাণ এই বিধ্বংসী ফলাফল। গোটা ডাক্তারি ক্ষেত্রটিই যে দুর্নীতির ঘুণপোকায় ঝাঁঝরা, তা এই ঘটনায় বে-আব্রু হয়ে গেছে, যার ফল হয়েছে মারাত্মক।
তৃতীয়ত, ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি। বলা হয়, তৃণমূল সরকার রাজ্যের কমবেশি ৩০ শতাংশ মুসলমানের ভোট একলপ্তে পায়। কিন্তু বিগত পনেরো বছরে মুসলিম সমাজেও এক নীরব শিক্ষিত শ্রেণির উত্থান ঘটেছে। এই পিছিয়ে-থাকা জনগোষ্ঠীর চাহিদা, আকাঙ্ক্ষাও বদলে গিয়েছে। শুধু ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা, ঐক্যশ্রী স্কলারশিপ আর বিজেপির জুজু দেখিয়ে সেই বিরাট জনসমষ্টিকে তুষ্ট রাখা যায়নি। ব্রিটিশ আসার আগে যে বৃহত্তর মুর্শিদাবাদ গোটা বিশ্বের প্রায় ৫ শতাংশ বাণিজ্যের অধিকারী ছিল, সেই মুর্শিদাবাদ আজ সবচেয়ে হতদরিদ্র জেলা। ২০১৯-এর পর থেকে তৃণমূল নেত্রী নরম হিন্দুত্বের লাইন নিয়েছিলেন। সরকারি কোষাগারের টাকায় একের পর এক হিন্দু মন্দির তৈরি করে বৃহত্তর হিন্দু জনগোষ্ঠীর মন পেতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু ‘হিন্দুত্বের’ রাজনৈতিক লাইনে বিজেপি অনেক বড়ো ও পুরোনো খেলোয়াড়। ওই লাইনে তাকে হারানো অসম্ভব। ফলত মুখ্যমন্ত্রীর ‘সফট হিন্দুত্ব’ আসলে বিজেপিকেই আরও বেশি জাস্টিফায়েড করেছে।
চতুর্থত, ‘আইপ্যাক’ নামক ভোটকুশলী সংস্থার হাতে দলের স্বতঃস্ফূর্ত, অরগ্যানিক, কিছুটা গণ-অংশগ্রহণমূলক কাঠামোটিকে তুলে দেওয়া ও তাকে ধ্বংস করার অবাস্তব পরিকল্পনা, পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে এই সংস্থাটির সঙ্গে আর্থিক ও ক্ষমতার দুর্নীতি অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। দল সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, যা নেতারা বুঝতে পারেননি।

নতুন বিজেপি সরকারের কাছে রাজ্যবাসীর প্রত্যাশা অনেক। প্রথমত, রাজ্যে একের পর এক বৃহৎ শিল্পের প্রতিষ্ঠা অবিলম্বে জরুরি। কর্মসংস্থান ও অর্থের সামাজিক জোগান তাতে বাড়বে, রেভিনিউ বাড়বে, ফলত উপকৃত হবে সরকারি ক্ষেত্র, চাঙ্গা হয়ে ঘুরে দাঁড়াবে বাজার। ভারতের মধ্যে সবচেয়ে কম মহার্ঘ ভাতা পান পশ্চিমবঙ্গের সরকারি কর্মচারী ও শিক্ষকেরা।
দ্বিতীয়ত, সরকারি শিক্ষাক্ষেত্রের সার্বিক পুনরুজ্জীবন চাই। এই ছন্নছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রটিকে পুনর্গঠিত করতে হলে আজকের বাজারোপযোগী ও যুগোপযোগী সিলেবাস, লজিস্টিকস ও অন্যান্য পরিকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন দরকার। এই কাজে সরকারি এবং বেসরকারি ক্ষেত্রের সমন্বয় জরুরি। গরিব, মধ্যবিত্তের সন্তানেরা যাতে পশ্চিমবঙ্গেই শিক্ষা পেয়ে এই রাজ্যেই চাকরি পায় তা নিশ্চিত করা দরকার।
তৃতীয়ত, ‘ইনক্লুসিভ’ সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো। এই ক্ষেত্রে ‘শত পুষ্প বিকশিত হোক’—এই লাইন অগ্রাধিকার পাক। কেবল কয়েকজনের সিন্ডিকেটের দাদাগিরির জন্য অনির্বাণ ভট্টাচার্যর মাপের গুণী শিল্পীকে বয়কট করা হয়েছে। বাংলায় বাম, দক্ষিণ, মধ্যপন্থা—সাংস্কৃতিক আঙিনায় এই খোলা হাওয়া আনুক নতুন বিজেপি সরকার—এটা সকলেরই প্রত্যাশা।
চতুর্থত, দুর্নীতিমুক্ত একটি স্বচ্ছ প্রশাসন চাই। চাকরি পেতে গেলে টাকা, বদলি পেতে গেলে টাকা, বাড়িতে ইট গাঁথতে গেলে টাকা, দোকান খুলতে গেলে টাকা, ব্যবসা করতে গেলে কাটমানির এই চক্র অবিলম্বে বন্ধ হোক। সর্বোপরি, হিন্দু, মুসলমান, ধনী, দরিদ্র, নারী, পুরুষ, উঁচু-নীচু নির্বিশেষে সমস্ত জাতি-বর্ণের মানুষের সার্বিক উন্নয়ন ঘটাক এই নতুন সরকার—গোটা রাজ্যবাসী সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে।
তৃণমূল কোনও হার্ডকোর মতাদর্শনির্ভর দল ছিল না। কিন্তু বিজেপি রেজিমেন্টেড এবং একটি নির্দিষ্ট আইডিওলজিভিত্তিক দল হলেও এবার কিন্তু তাঁরা রাজ্যের সাড়ে দশ কোটি মানুষের শাসক। সম্পূর্ণ পক্ষপাতমুক্ত, উদার, সমন্বয়ী একটি নতুন সরকারের প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছে জনগণ। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি ও বাঙালি জাতিসত্তার কিছু পৃথক নিজস্বতা রয়েছে। আশা করা যায়, সেই নিজস্বতা ও অস্মিতার জায়গাগুলোকে তাঁরা মর্যাদা দেবেন।
লেখক - অর্ণব সাহা কলকাতার শেঠ আনন্দরাম জয়পুরিয়া কলেজের শিক্ষক। প্রতিবেদনটি এবিপি আনন্দ, এবিপি লাইভ বাংলা ও এবিপি নেটওয়ার্ক কর্তৃক লিখিত ও সম্পাদিত নয়। মতামত লেখকের নিজস্ব।
Disclaimer: This content is aggregated dynamically from public feeds distributed by ABP Ananda - Blog. It has not been created, edited, or verified by our team. View our full terms on the policy page.
অর্ণব সাহা