নিম্নচাপ চলে গেলেও রাজ্যে ভয়ঙ্কর দুর্যোগ? কেন? এর পিছনে ভৌগলিক কারণটি কী?

Audio Narrative Assistant
Executive Summary
কলকাতা : বঙ্গোপসাগরে তৈরি গভীর নিম্নচাপ ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করে ক্রমশ পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে গিয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সিস্টেমটি ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগঢ় এবং দক্ষিণ-পূর্ব উত্তরপ্রদেশ পেরিয়ে সংলগ্ন মধ্যপ্রদেশের দিকে পৌঁছেছে। গভীর নিম্নচাপ থেকে দুর্বল হয়ে সেটি এখন সুস্পষ্ট নিম্নচাপের রূপ নিয়েছে।

কলকাতা : বঙ্গোপসাগরে তৈরি গভীর নিম্নচাপ ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করে ক্রমশ পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে গিয়েছে। মঙ্গলবার সকালে সিস্টেমটি ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, ছত্তীসগঢ় এবং দক্ষিণ-পূর্ব উত্তরপ্রদেশ পেরিয়ে সংলগ্ন মধ্যপ্রদেশের দিকে পৌঁছেছে। শক্তিও কমেছে। গভীর নিম্নচাপ থেকে দুর্বল হয়ে সেটি এখন সুস্পষ্ট নিম্নচাপের রূপ নিয়েছে। তা হলে প্রশ্ন উঠছে, নিম্নচাপ যখন বাংলা থেকে এতটা দূরে চলে গিয়েছে, তখনও কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি হচ্ছে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর ভৌগলিক কারণ ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন আবহবিদ রবীন্দ্র গোয়েঙ্কা । 

অনেকেরই ধারণা, নিম্নচাপ যতক্ষণ কোনও এলাকার কাছে থাকে, ততক্ষণই বৃষ্টি হয়। সিস্টেম দূরে সরে গেলেই আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আবহাওয়ার অঙ্ক সব সময় এতটা সরল নয়। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নচাপ স্থলভাগের দিকে সরে যাওয়ার পরেও তার প্রভাবে বৃষ্টি বাড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তারই ইঙ্গিত মিলছে।

নিম্নচাপ দূরে, তবু বৃষ্টি কেন?

এর প্রধান কারণ হল বঙ্গোপসাগর থেকে ক্রমাগত জলীয় বাষ্পের সরবরাহ। নিম্নচাপটি স্থলভাগে ঢুকে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে গেলেও তার বিস্তৃত বায়ুপ্রবাহের প্রভাব এখনও বজায় রয়েছে। সহজ ভাষায় বললে, নিম্নচাপের কেন্দ্র দূরে সরে গেলেও তার সঙ্গে যুক্ত বায়ুপ্রবাহ বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে আর্দ্র বাতাস স্থলভাগের দিকে টেনে আনতে পারে। এই আর্দ্র বাতাসের একটি বড় অংশ দক্ষিণবঙ্গের উপর দিয়ে নিম্নচাপের দিকে এগোয়। ফলে কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের আকাশে মেঘ তৈরি হয় এবং বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকে। এই কারণেই অনেক সময় নিম্নচাপের কেন্দ্র কাছাকাছি থাকার তুলনায় সেটি কিছুটা দূরে সরে যাওয়ার পরে কোনও অঞ্চলে বৃষ্টি বাড়তে দেখা যায়। সাম্প্রতিক আবহাওয়া পরিস্থিতিতেও কলকাতায় গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়েছে। নিম্নচাপটি ঝাড়খণ্ড ও সংলগ্ন অভ্যন্তরীণ ওড়িশার দিকে সরে যাওয়ার পর বৃষ্টির তীব্রতা ধীরে ধীরে কমার সম্ভাবনা থাকলেও দক্ষিণবঙ্গে বিক্ষিপ্ত বৃষ্টি বজায় থাকতে পারে।

নিম্নচাপ কি ‘পাম্প’-এর মতো কাজ করছে?

আবহাওয়ার ভাষায় বিষয়টিকে অনেকটা moisture transport বা জলীয় বাষ্প পরিবহণ হিসেবে বোঝানো যায়। স্থলভাগের উপর থাকা নিম্নচাপের দিকে চারপাশের বাতাস ছুটে আসে। বঙ্গোপসাগর কাছাকাছি থাকায় সেখান থেকে আর্দ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমী বাতাস দক্ষিণবঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। অর্থাৎ, সিস্টেমের কেন্দ্র মধ্য বা পূর্ব ভারতের দিকে থাকলেও তার ‘ফিডার ব্যান্ড’ বা আর্দ্রতা সরবরাহকারী বায়ুপ্রবাহ বাংলার উপর সক্রিয় থাকতে পারে।

ফলে তিনটি ঘটনা ঘটে—

  • বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প ঢুকতে থাকে
  • দক্ষিণবঙ্গের উপর মেঘ তৈরি হয়
  • অনুকূল এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টি হয়
  • এই কারণেই নিম্নচাপ দূরে সরে যাওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।

মৌসুমি অক্ষরেখার ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ

দক্ষিণবঙ্গের বৃষ্টির নেপথ্যে শুধু নিম্নচাপ নয়, মৌসুমি অক্ষরেখা বা Monsoon Trough-এর অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্ষাকালে এই অক্ষরেখা অনেকটা বৃষ্টির ‘করিডর’-এর মতো কাজ করে। নিম্নচাপ সাধারণত এই মৌসুমি অক্ষরেখা ধরে পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে যায়। বর্তমান সিস্টেমটিও ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করে স্থলভাগের উপর দিয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে যুক্ত মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ এবং বঙ্গোপসাগরের আর্দ্রতা দক্ষিণবঙ্গের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলছে। তাই নিম্নচাপের মূল কেন্দ্র বাংলা থেকে দূরে থাকলেও তার পিছনে তৈরি হওয়া আর্দ্রতার পথ সক্রিয় থাকলে বৃষ্টি চলতে পারে।

সোমবার কেন হঠাৎ বাড়ল বৃষ্টি?

বর্তমান সিস্টেমটির গতিপথ লক্ষ্য করলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখা যায়। প্রথম দিকে ঘূর্ণাবর্ত এবং পরে নিম্নচাপটি যখন উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে ছিল, তখন কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের সর্বত্র সারাদিন একটানা বৃষ্টি হয়নি। বরং কোথাও রোদ, কোথাও আংশিক মেঘলা আকাশ এবং কোথাও বজ্রবিদ্যুৎ-সহ স্বল্প সময়ের বৃষ্টি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু সিস্টেমটি ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করে স্থলভাগে প্রবেশ করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়।

স্থলভাগে নিজের ঘূর্ণন ও নিম্নচাপীয় চরিত্র বজায় রাখতে সিস্টেমটির দিকে বঙ্গোপসাগর থেকে আর্দ্র বাতাসের প্রবাহ জোরালো হয়। সেই আর্দ্রতার একটি বড় অংশ দক্ষিণবঙ্গের উপর দিয়ে যেতে শুরু করায় সোমবার সকাল থেকে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় মেঘ ও বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, নিম্নচাপ দূরে সরে যাওয়ার পরেও তার দিকে বঙ্গোপসাগরের জলীয় বাষ্প যাওয়ার পথের মধ্যে পড়েছে দক্ষিণবঙ্গ। এই কারণেই বৃষ্টির প্রভাব বজায় রয়েছে।

নিম্নচাপ মানেই কি সারাদিন মেঘ-বৃষ্টি?

না। নিম্নচাপ তৈরি হলেই সব জায়গায় সারাদিন কালো মেঘ, ঝড় এবং একটানা বৃষ্টি হবে—এই ধারণা ঠিক নয়। কোনও নিম্নচাপের প্রভাবে কোথায় এবং কতটা বৃষ্টি হবে, তা একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে। যেমন—সিস্টেমটির অবস্থান, তার গতিপথ, মৌসুমি অক্ষরেখার অবস্থান, বঙ্গোপসাগর থেকে কতটা জলীয় বাষ্প ঢুকছে এবং কোনও এলাকা সিস্টেমটির কোন দিকে রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ঘূর্ণাবর্তটি যদি বাংলাদেশ সংলগ্ন এলাকায় তৈরি হয় এবং মৌসুমি অক্ষরেখা কলকাতার পূর্ব দিক দিয়ে বিস্তৃত থাকে, তা হলে কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে দীর্ঘ সময় মেঘলা আকাশ, দমকা হাওয়া এবং ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়তে পারে। আবার কোনও সিস্টেম যদি উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর থেকে ওড়িশা হয়ে উত্তর-পশ্চিম দিকে চলে যায়, তা হলে প্রথমে বিক্ষিপ্ত বজ্রবৃষ্টি এবং পরে আর্দ্রতার প্রবাহ বাড়লে বিস্তৃত বৃষ্টি দেখা যেতে পারে।

আরও কতদিন বৃষ্টি চলবে?

সিস্টেমটি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে এবং আরও পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে সরে যাচ্ছে। ফলে কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টির সামগ্রিক তীব্রতা ধীরে ধীরে কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বৃষ্টি পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা এখনই নেই। বঙ্গোপসাগর থেকে আর্দ্রতার প্রবাহ এবং সক্রিয় মৌসুমি পরিস্থিতির কারণে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি চলতে পারে। কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টিও হতে পারে। IMD-র পূর্বাভাসে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে আগামী দিনগুলিতেও বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুতের সম্ভাবনা রাখা হয়েছে। ১০ জুলাই উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক-দুই জায়গায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। সেই সঙ্গে আজ, মঙ্গলবার থেকে আগামী রবিবার পর্যন্ত, ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে উত্তরবঙ্গে। 

কোথায় বেশি বৃষ্টির সম্ভাবনা?

উপকূলবর্তী এবং পশ্চিমের জেলাগুলিতে বিক্ষিপ্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় মেঘলা আকাশের পাশাপাশি দফায় দফায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। তবে বর্ষাকালের বৃষ্টির চরিত্র অনুযায়ী সব জায়গায় একই সময়ে বা একই পরিমাণ বৃষ্টি হবে না। এক এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলেও কয়েক কিলোমিটার দূরে তুলনামূলক কম বৃষ্টি হতে পারে। সর্বশেষ সরকারি পূর্বাভাসে দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি চলার পাশাপাশি বজ্রবিদ্যুৎ ও ঘণ্টায় ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়ার সম্ভাবনাও রাখা হয়েছে।

এক কথায় বৃষ্টির আসল কারণ কী?

নিম্নচাপ বাংলা থেকে দূরে চলে গেলেও তার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়নি। সিস্টেমটির দিকে এখনও বঙ্গোপসাগর থেকে আর্দ্র বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। সেই আর্দ্রতার পথের মধ্যে রয়েছে দক্ষিণবঙ্গ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সক্রিয় মৌসুমি বায়ুপ্রবাহ এবং মৌসুমি অক্ষরেখার প্রভাব। এই তিনটি কারণ মিলিয়েই নিম্নচাপ দূরে সরে যাওয়ার পরেও কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গে বৃষ্টি হচ্ছে। 

 

Disclaimer: This content is aggregated dynamically from public feeds distributed by ABP Ananda - Districts. It has not been created, edited, or verified by our team. View our full terms on the policy page.

Published Via: ABP Ananda - Districts

Read Previous

Baruipur Incident: ‘তিন দিন পর...

Read Next

Baraipur Case Updates: 'নেশার পর...