We currently don't have news in this language. Please choose another language.
বিশ্বাস থাক বরুণে
সুমন দে
[ ২১/০৭/২০১৩-তারিখে এই লেখাটি প্রকাশিত হয় আনন্দবাজার পত্রিকার এবেলা-তে। ঘটনাচক্রে আজ বরুণ বিশ্বাসের ভয়াবহ খুনের ১৪ বছর হল । দীর্ঘ ১৪ বছর পরেও যখন বিচার পাওয়া গেল না এবং এখনও বরুণের দিদি প্রমীলা বিশ্বাস এবং দাদা অসিত বিশ্বাস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তখন মনে হল এই লেখাটি আরও একবার মানুষের সামনে নিয়ে আসা উচিত।]
বরুণ বিশ্বাস কে?
৭ জুলাই ২০১২-র আগে এ প্রশ্নের উত্তর এই পেশাদার সাংবাদিকেরও অজানা ছিল। মনে আছে, শনিবার অপেক্ষাকৃত কম খবরের মাঝে লাইভ আউটপুট মনিটরবাহিত হয়ে ওবি ভ্যান থেকে পাঠানো দৃশ্যাবলী গোটা নিউজ রুমের চোখ টেনে রেখেছিল। মিত্র ইনস্টিটিউশন (মেন) ছুঁয়ে এক নিহত শিক্ষকের শেষযাত্রা নিমতলা ঘাটের দিকে। রাজনৈতিক নেতা নন, পিছনে সংগঠিত পেশীপ্রদর্শন নেই, বৈভবের দেখনদারি নেই— তবু হাজার-হাজার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সে মিছিল, নীরব শ্রদ্ধা আর অসহায় ক্রোধে মাখামাখি হয়ে নজর কেড়ে নিয়েছিল সংবাদমাধ্যমের। বরুণ বিশ্বাস। নামটা সেই শুনলাম।
সুটিয়ার লজ্জা
মধ্যযুগেও কি বর্বরতার এমন উদাহরণ ছিল? আজ থেকে বারো-তেরো বছর আগে বাম আমলে উত্তর চব্বিশ পরগণার গাইঘাটার সুটিয়া গ্রামের নাম তখন মুখে মুখে ‘ধর্ষণ গ্রাম’। বাংলাদেশ সীমানা লাগোয়া এই এলাকা তখন দাগি খুনি, মাফিয়া, ধর্ষক— দুষ্কৃতীদের মুক্তাঞ্চল। কখনও সুশান্ত চৌধুরী, কখনও প্রভাস ঢালী, কখনও বীরেশ্বর ঢালীদের ‘কার্গিল বাহিনী’-র নারকীয় অত্যাচারের কোনও প্রতিকার ছিল না— কারণ পিছনে ছিল প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ও পুলিশ-প্রশাসনের একাংশের স্পষ্ট ও সক্রিয় মদত। অরাজক সে সময়ে এলাকার অন্তত বত্রিশজন মহিলা গণধর্ষণের শিকার হন (অনেকে ভয়ে ও লজ্জায় তখন অভিযোগ করেননি) এবং বারোজন মানুষ খুন হন। এই মাৎস্যন্যায়ের বিরুদ্ধেই অল্প কিছু মানুষ সাহসে ভর করে গঠন করলেন ‘প্রতিবাদী মঞ্চ’। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সেই মঞ্চের ডাকে ২৭ জুলাই, ২০০২-এর এক সভায় সভাপতি ননীগোপাল পোদ্দারের হাত থেকে মাইক কেড়ে স্বপ্নালু চোখের ছিপছিপে চেহারার এক ঝোড়ো যুবক গর্জে উঠল, “আমরা যদি আমাদের মা-মেয়ে-বউ-বোনের সম্মান রক্ষা করতে না পারি, তাহলে সভ্য সমাজে আমাদের থাকা উচিত নয়। ধর্ষকদের মুখোমুখি হওয়ার সাহস না থাকলে, তাদের থেকেও বেশি শাস্তি হওয়া উচিত আমাদের।”
মাটি থেকে উঠে আসা এক নেতার জন্ম হল সেদিন।
বরুণ বিশ্বাস।
আন্দোলনের চাপে ধরা পড়েছিল প্রধান অভিযুক্ত-সহ পাঁচজন। একজন অভিযুক্তর হাতে রামকৃষ্ণ কথামৃত তুলে দিয়ে বরুণ বলেছিলেন, ‘জেলে বসে পড়িস’।
লজ্জার এটাই, এহেন বরুণকে মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যম চিনল তাঁর মৃত্যুর পর। এবিপি আনন্দ বা বেসরকারি কোনও নিউজ চ্যানেলের না-হয় জন্মও হয়নি, কিন্তু কলকাতা থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে সুটিয়ায় গণধর্ষণের ঘটনা কতটা উঠে এসেছিল তখনকার সংবাদমাধ্যমে ? প্রশ্নগুলো অবধারিতভাবেই উঠছে।
খুনি রাজনীতি
প্রতিবাদী মঞ্চকে ভোট-রাজনীতির পাঁক থেকে দূরে রেখেছিলেন বরুণ। তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর অবশ্য নির্লজ্জ দলীয় রাজনীতির পঙ্কিলতা বড় প্রকাশ্য !

সভ্য সমাজে সুটিয়ার সব ধরনের অপরাধের মুক্তাঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠা ও তার লালন-পালনের যাবতীয় দায় নিঃসন্দেহে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের। তবে এটাও সত্যি, অপরাধীদের গ্রেফতার ও যাবজ্জীবনও বাম আমলেই হয়েছে। দশ বছর আগে যারা জেলে ঢুকেছে, যদি তারাই বরুণ খুনের ‘সুপারি’ দিয়ে থাকে, তবে সে ‘বদলা’-র সাহসটা কিন্তু তারা ‘বদলের সরকার’ রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরই দেখিয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা, ৫ জুলাই ২০১২ সন্ধ্যায় গোবরডাঙা ১নং প্ল্যাটফর্মের পাশে রাখা মোটর সাইকেলে উঠতে যাওয়ার সময়ে গুলিবিদ্ধ বরুণ দীর্ঘক্ষণ পড়েছিলেন তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের অফিসের সামনে। সুটিয়া প্রতিবাদী মঞ্চের সভাপতি, দু’দুবার আততায়ীর আক্রমণে গুলিবিদ্ধ, ননীগোপাল পোদ্দার লিখছেন, “যতক্ষণ বরুণের দেহে প্রাণ ছিল ওর মুখে ছিল, ‘আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও’ রব। তৃণমূল শ্রমিক সংগঠন অফিসে অন্তত ১৫/২০ জন সদস্য বর্তমান থাকলেও কেউ ছুটে আসেনি বরুণকে বাঁচাতে।” প্রশ্ন উঠছে, কারা সেদিন ‘ছোঁবেন না, ধরবেন না’ বলে রক্তাক্ত গুলিবিদ্ধ বরুণকে কোনও সাহায্যটুকুও করেনি? কারা সেই বৃহস্পতিবার রাতে হাসপাতালে ‘আমাদের লোক’ বলে হামলে পড়ে স্লোগান তুলেছিল? আর এখন, যে মুহূর্তে বরুণের বাবা জগদীশ বিশ্বাস অভিযোগ করেছেন যে বরুণ খুনের ষড়যন্ত্রে জড়িত তৃণমূলী সরকারের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, কারা শোকার্ত বৃদ্ধ পিতার বিরুদ্ধেই মামলা ঠুকেছে?
এখানেই শেষ নয় কুৎসার আখ্যান। বরুণের মৃত্যুর এক বছর পূরণ হওয়ার পরের দিনই তৃণমূল নেতা মিহির বিশ্বাস অভিযোগ করে গাইঘাটা থানায় রীতিমতো এফআইআর দায়ের করলেন যে বাংলাদেশী দুষ্কৃতীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁকে খুনের চক্রান্ত করেছেন বরুণ বিশ্বাসের বৃদ্ধ বাবা এবং প্রতিবাদী মঞ্চের সদস্যরা। সঙ্গে যোগ করেছেন (প্রায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফর্মুলা মেনেই) এই চক্রান্তে রয়েছে সিপিএম, কংগ্রেস ও মাওবাদীরাও!
‘পরিবর্তন’ বটে!
চাকে ঢিল
অনেকের মতে অবশ্য শুধু ধর্ষকদের জেলে পোরা নয়, আরও বড় মৌচাকে ঢিল মেরেছিলেন নির্লোভ অকুতোভয় বরুণ। ইছামতি ও যমুনা নদীর সঙ্গমস্থলে বাঁধ দিয়ে নদীর গতিপথকে অবরুদ্ধ করে সরাসরি রাজনৈতিক মদতপুষ্ট কিছু অতীব প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ইটভাটা ও মাছের ভেড়ি গড়ে কোটি কোটি মুনাফা লুটতেন। সেই বিপুল টাকার অংশ নিঃশব্দে পৌঁছে যেত রাজনৈতিক দাদা-দিদির কোঁচড়ে। বরুণ প্লাবন রুখতে ১৮-২০ কিমি নদীখাল সংস্কারের জন্য টাকার অনুমোদন করিয়ে আনতেই শশব্যস্ত হয়ে পড়ে স্বার্থান্বেষীরা। অনেকের সন্দেহ, বরুণের দিকে ছুটে আসা বুলেটগুলোর পিছনে হাত আছে এই রাজনৈতিক-ব্যবসায়ী স্বার্থের।
অপ-রূপকথা
দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ‘ঠাকুরমার ঝুলি’-তে বোন কিরণমালাকে বরুণ বলেছিল— “এই তীর-ধনুক রাখ, আমি চলিলাম। যদি তীরের আগা ধসে, ধনুর ছিলা ছেঁড়ে, তো জানিও আমিও নাই।”
কী আশ্চর্য, বরুণ বিশ্বাসের মৃত্যুর এক বছর পরও তীরের ফলা খসেনি, ধনুকের ছিলা ছেঁড়েনি! ওবি ভ্যান থেকে বরুণের মা গীতাঞ্জলি বিশ্বাসের সাউন্ডবাইট আসছিল— “আমি যদি আছাড়ি-পিছাড়ি করে কাঁদি, তাহলে অন্য মা ভয় পাবে। কেউ আর তার ছেলেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে বরুণ হতে বলবে না বাবা...”
বিশ্বাস, বরুণ বিশ্বাস-রা মরেন না।
Disclaimer: This content is aggregated dynamically from public feeds distributed by ABP Ananda - Districts. It has not been created, edited, or verified by our team. View our full terms on the policy page.
সুমন দে