বাংলায় নিঃশব্দ বিপ্লব : মানুষের প্রত্যাশা

Audio Narrative Assistant
Executive Summary
রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী বোঝা যাচ্ছিল, মানুষ একটা পরিবর্তন চাইছে, সেটা যে একটা সুনামি হতে পারে, তা ভাবা যায়নি। নীরব মানুষের প্রতিবাদ কী ভয়ংকর, বোঝা গেছে। স্বৈরাচারের আস্ফালন আর মিথ্যাচার রুখতে মানুষের একমাত্র অস্ত্র মানুষের ‘তর্জনী শক্তি’।

রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী

বোঝা যাচ্ছিল, মানুষ একটা পরিবর্তন চাইছে, সেটা যে একটা সুনামি হতে পারে, তা ভাবা যায়নি। নীরব মানুষের প্রতিবাদ কী ভয়ংকর, বোঝা গেছে। স্বৈরাচারের আস্ফালন আর মিথ্যাচার রুখতে মানুষের একমাত্র অস্ত্র মানুষের ‘তর্জনী শক্তি’। আমাদের  গণতন্ত্র বহুক্ষেত্রে ব্যর্থ হলেও এখানেই সে সফল। পশ্চিমবঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘদিন রাজত্বকারী সিপিআইএম এককভাবে ১৯৯১ সালে সবচেয়ে বেশি ১৮৯ আসন পেয়েছিল। বিজেপির ২০৭ ম্লান করেছে সেই সাফল্য। তৃণমূল তার শাসন শুরু করেছিল ২০১১ সালে ১৮৪  দিয়ে। ২০১৬ এবং ২০২১ সালে ২০০ অতিক্রম করলেও ভূতুড়ে ভোটার, আতর, কালো টেপের অবদান ছিল যথেষ্ট। এক নির্ভেজাল ভোটে দৃশ্যত সামান্য সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে বিজেপির ‘কেরামতি’ দেখার মতন। মানুষ পরিবর্তন এনেছে বিপুল প্রত্যাশায়। এখন সরকারি কার্যক্রমে কেরামতি দেখাতেই হবে।

ব্যাপকভাবে বাংলার মেধা ও শ্রম পাড়ি দিচ্ছে দেশ-দেশান্তরে। যাদের অন্যত্র যাবার উপায় নেই, ভুগছে হতাশায়। ‘ভাতা’ কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, চাই ভদ্র সভ্য চাকুরি যা সহজে কেউ কেড়ে নেবে না। এর জন্য বিনিয়োগের যাবতীয় বাধা দূর করতে হবে। বঙ্গভূমি ভারী শিল্প এবং আইটি শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হবার যোগ্য।  CPIM বা তৃণমূল পারে নি, কেন্দ্রের সঙ্গে ঝগড়া করে। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ শক্তির আত্মপ্রকাশ জরুরি।

ভোটাররা রাজ্য পুলিশের সম্পূর্ণ সংস্কার এবং "সিন্ডিকেট" (নির্মাণ ও চুক্তি নিয়ন্ত্রণকারী স্থানীয় কার্টেল) এবং "কাটমানি" (পার্টি কর্মীদের অবৈধ কমিশন) সংস্কৃতির সম্পূর্ণ অবসান চায়। পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যসেবা বিপন্ন। মানুষ চায় স্বাস্থ্য পরিষেবার আমূল পরিবর্তন। আয়ুষ্মান ভারত পরিকল্পনা দ্রুত চালু সারা ভারত জুড়ে স্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশীদার হতে পারবে বাঙালিরাও। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্প ব্যাপক দুর্নীতিতে আছন্ন। স্বচ্ছভাবে এই পরিকল্পনা রূপায়ণের সঙ্গে কাল বিলম্ব না করে MNREGA পুনরায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এই প্রকল্পে  কর্মহীনদের সাময়িক কর্মসংস্থানের সাথে অবকাঠামো তৈরিও  হয়। আর জি কর ঘটনার পরে, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা এবং আরও স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থায় পদ্ধতিগত সংস্কারের জন্য একটি বিশাল প্রত্যাশা রয়েছে। বিজেপি অবৈধ অভিবাসন এবং ভোটার তালিকা শুদ্ধকরণের স্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেটা ভুলে গেলে চলবে না।


এক সময় ভাবা হোত সিপিএমের মতো তৃণমূলও বাংলায় এক দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরি করেছে। কিন্তু SIR প্রক্রিয়ায় ব্যাপক ‘ভূতুড়ে’ ভোটারের অবসান ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সজীব উপস্থিতিতে টিএমসির ‘ভোট সুচারু’ দাপুটে কর্মী বাহিনীকে অকেজো হয়ে পরে। ‘বাড়তি’ ভোট মেলেনি। তৃণমূলের ৮ শতাংশ ভোট কমার পেছনে এটা সবচেয়ে বড় কারণ হলেও, অন্য  যে সব ঘটনায় তৃণমূল পর্যুদস্ত তা হোল আরজি কর মেডিকেল কলেজের নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যা। এই ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এবং হাসপাতাল প্রশাসনকে রক্ষা করতে সরকারের অনুভূত প্রচেষ্টা শহুরে মধ্যবিত্ত এবং মহিলাদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার থেকে গভীরভাবে বিচ্ছিন্ন করে। ২০২৫ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পঁচিশ হাজারের বেশি শিক্ষক নিয়োগ বাতিল ভোটারদের দুর্নীতির মাত্রার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রাক্তন মন্ত্রীদের সহযোগীদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া নগদ অর্থের দৃশ্য জনমনে এতটাই তাজা ছিল যে তৃণমূল আর দুর্নীতি প্রায় সমার্থক হয়ে পড়েছিল।

ঐতিহাসিকভাবে, রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় তিরিশ বত্রিশ শতাংশ সমন্বিত মুসলিম ভোট তৃণমূলের "সুরক্ষা জাল" হিসাবে কাজ করে এসেছে। বামেরাও এই সুরক্ষা পেয়েছিল। আম জনতা উন্নয়ন পার্টি (এজেইউপি) এবং আইএসএফের মতো নতুন খেলোয়াড়রা মুসলিম চেতনা গড়ে তোলার ওপর জোর দেয়। মুসলিমদের ‘ভোট ব্যাংক’ না হতে পরামর্শ দেয়। এতে এদের আসন না বাড়লেও ভোট বেড়েছে। ওদেরেই আহ্বানে মুর্শিদাবাদ ও মালদহের সংখ্যালঘু বেল্টে কংগ্রেস এবং সিপিআই(এম) কিছুটা পুনরুজ্জীবিত। বিজেপি বিরোধী ভোট বিভক্ত হওয়ায় তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিও বিজেপি দখল করেছে।

স্থানীয় স্তরের তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ক্ষোভ ছিল। ভোটাররা দৈনন্দিন জীবনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তৃণমূলের "শ্বাসরোধ করা" কাজকর্মে। তোলাবাজি ও হুমকি ছিল সর্বত্র। ঠিকাদার, সুরক্ষা কর্মী এমনকী ছোট খাটো ব্যবসার কর্মী নিয়োগ করা যেত না পাড়ার তৃণমূল ‘দাদা’দের সমর্থন ছাড়া।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অজেয়তার আভা ভেঙে দিয়েছে নিজের আসন ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পনেরো হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজয়। তৃণমূল সমর্থকরাও নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। অনেকেই হয়ে পড়েছেন ‘স্বঘোষিত বিজেপি’ নেতা। এতদিন অন্য দল ভেঙে আনন্দ পেতেন যিনি আজ তার দল ভাঙছে ‘তাসের দেশের’ মতন।

লেখক - রাজাগোপাল ধর চক্রবর্ত্তী একজন অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ। প্রতিবেদনটি এবিপি আনন্দ, এবিপি লাইভ বাংলা ও এবিপি নেটওয়ার্ক কর্তৃক লিখিত ও সম্পাদিত নয়। মতামত লেখকের নিজস্ব। 

Disclaimer: This content is aggregated dynamically from public feeds distributed by ABP Ananda - Blog. It has not been created, edited, or verified by our team. View our full terms on the policy page.

Published Via: ABP Ananda - Blog

Read Previous

ইতিহাসের অনিবার্য...

Read Next

এন্টোমো বিজনেস :...