পশ্চিমবঙ্গের জন্মকথা : বাঙালি হিন্দুর বাঁচার লড়াই ও ভারত কেশরী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের দূরদর্শী রাজনীতি

Audio Narrative Assistant
Executive Summary
পশ্চিমবঙ্গ দিবস  ভূমিকা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একসময়ে বহু দেশপ্রেমিক যুবক ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে জাতীয় সংগ্রামের একটি রাজনৈতিক বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু একই সময়ে ভারতীয় রাজনীতির ভেতরে আরেকটি প্রবণতাও দৃশ্যমান হতে শুরু করে-মুসলিম সমাজের একাংশ পৃথক রাজনৈতিক পরিচয়, প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থরক্ষার দাবিকে সামনে আনতে থাকে। পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতার মধ্য দিয়েই উপমহাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এবং পরবর্তীকালের ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’-এর ভিত্তি শক্তিশালী হতে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গ দিবস 

ভূমিকা

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একসময়ে বহু দেশপ্রেমিক যুবক ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে জাতীয় সংগ্রামের একটি রাজনৈতিক বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু একই সময়ে ভারতীয় রাজনীতির ভেতরে আরেকটি প্রবণতাও দৃশ্যমান হতে শুরু করে-মুসলিম সমাজের একাংশ পৃথক রাজনৈতিক পরিচয়, প্রতিনিধিত্ব ও স্বার্থরক্ষার দাবিকে সামনে আনতে থাকে। পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতার মধ্য দিয়েই উপমহাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন এবং পরবর্তীকালের ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’-এর ভিত্তি শক্তিশালী হতে থাকে।

শিমলা ডেপুটেশন ও পৃথক প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি ১৯০৫ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ভারতের ভাইসরয় ছিলেন লর্ড মিন্টো। তাঁর সহধর্মিণী মেরি ক্যারোলিন গ্রে, যিনি ‘লেডি মিন্টো’ নামে পরিচিত, সে সময়কার বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষক ছিলেন। ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর আগা খানের নেতৃত্বে ‘শিমলা ডেপুটেশন’ ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। প্রতিনিধি দল মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচনমণ্ডলী, জনসংখ্যার অনুপাতে বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সরকারি চাকরিতে সুযোগ বৃদ্ধির দাবি জানায়। লেডি মিন্টো এই বৈঠকের সাক্ষী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর ডায়েরিতে এই ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মুসলিম নেতৃত্বের এই উদ্যোগ কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকল্প রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করতে পারে।

পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার দাবির প্রেক্ষিতে ভাইসরয়ের আশ্বাস- পরবর্তীকালে ১৯০৯ সালের ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট’-এ প্রতিফলিত হয় এবং পৃথক নির্বাচনী মণ্ডলীর ধারণা আইনগত স্বীকৃতি লাভ করে।

মুসলিম লিগের উত্থান ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস

শিমলা ডেপুটেশনের অল্প সময়ের মধ্যেই ১৯০৬ সালে ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের প্রতিষ্ঠা হয়। পরবর্তী কয়েক দশকে মুসলিম লিগ মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত করে। পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থার ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ক্রমশ ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রূপ পেতে শুরু করে। অনেক ঐতিহাসিকের মতে, এই কাঠামো ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমান্তরাল বিকাশকে উৎসাহিত করে।

স্বাধীনতার প্রাক্কালে বাংলা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা
১৯৪০-এর দশকে এসে বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। মুসলিম লিগ পাকিস্তান দাবিকে সামনে এনে রাজনৈতিক আন্দোলনকে তীব্র করে তোলে। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ঘোষিত ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-এর পর কলকাতায় ভয়াবহ,নৃশংস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও হত্যা এবং সামাজিক অস্থিরতার বহু বিবরণ ইতিহাসে নথিভুক্ত হয়েছে। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে ভিন্নতা রয়েছে। মৃত্যুর সংখ্যা কেউ বলেন ৫০,০০০ আবার কেউ বলেন ১,০০,০০০ (এক লক্ষ)।

কলকাতার ঘটনার দুই মাসের মধ্যেই হিন্দু প্রধান নোওয়াখালিতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুরু হয়। বিভিন্ন বিবরণে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং নারীর ওপর সহিংসতার কথা উঠে এসেছে। পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্দেশ্যে মহাত্মা গান্ধী সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন। এই ঘটনাগুলি বাংলার সাধারণ মানুষের মানসিকতা ও রাজনৈতিক অবস্থানকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

বাংলা বিভাজন প্রশ্নে রাজনৈতিক মতভেদ
স্বাধীনতার পূর্বমুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়— বাংলা কি অখণ্ড থাকবে, নাকি বিভক্ত হবে? একদিকে ছিল ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল’-এর ধারণা, অন্যদিকে বাংলার একাংশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয় যে, সমগ্র বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বঙ্গ বিভাজনের পক্ষে জনমত সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সভা করেন এবং যুক্তি দেন যে, হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত রাখার জন্য বিভাজন প্রয়োজন।

এই সময় আরও নেতাকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন এই শ্যামাপ্রসাদ। যারা রাজনৈতিক ও সামাজিক  জনমত গঠনে অংশ নেন। সুচেতা কৃপালনীও কলকাতায় শ্রদ্ধানন্দ পার্কে  সভা করে ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল’ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।

মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা ও ঐতিহাসিক ভোট
শ্যামাপ্রসাদ প্রেরিত মাউন্টব্যাটেন কে দেওয়া সাহসী চিঠি এবং ১১ই মে পন্ডিত নেহরুকে দেওয়া রাজনৈতিক পত্রের প্রভাবেই ১৯৪৭ সালে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের অধীনে ঘোষিত ‘থার্ড জুন প্ল্যান’-এ বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আইনসভার সদস্যদের ভোটের ব্যবস্থা করা হয়। এর ঐতিহাসিক প্রমাণ হচ্ছে তিন দিনের মধ্যে অর্থাৎ ১৪ই মে,১৯৪৭ শ্যামাপ্রসাদকে দেওয়া নেহরুর উত্তর। ২০ জুন ১৯৪৭ অনুষ্ঠিত হয় গুরুত্বপূর্ণ ভোটগ্রহণ।

ভোট প্রক্রিয়া তিনটি ধাপে বিভক্ত ছিল—
১. যৌথ অধিবেশন— বাংলা অখণ্ড থাকবে কি না।
২. মুসলিম-অধ্যুষিত অঞ্চলের প্রতিনিধিদের মতামত। অর্থাৎ তাঁরা ভারতে না পাকিস্তানে কোথায় থাকতে চান। ফল - পাকিস্তানে এবং তাঁরা নূতন সংবিধান তৈরি করতে চান।
৩. অমুসলিম বা হিন্দু-অধ্যুষিত অঞ্চলের প্রতিনিধিদের সিদ্ধান্ত।
৫৮-২১ ভোটে নির্ণয় হয় বাংলা বিভক্ত হোক এবং তাঁরা ভারতে থাকতে চান এবং ভারতের সংবিধানেই তাঁরা মান্যতা দেবেন।
এই ভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলা বিভক্ত হয়।

পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা: ইতিহাস ও উত্তরাধিকার
বাংলা বিভাজনের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি ছিল রাজনৈতিক আলোচনা, জনমত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং উপমহাদেশের পরিবর্তিত বাস্তবতার সম্মিলিত ফল। অর্থাৎ এই ২০ জুনই নির্ণয় হয়ে গেল ভারতের স্বাধীনতায় পশ্চিমবঙ্গ অংশটি ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবে আর পূর্ববঙ্গ পূর্ব পাকিস্তান হয়ে পাকিস্তানের অংশ হবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট-স্বাধীনতা ও বিভাজনের ইতিহাস কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের উদ্বেগ, আকাঙ্ক্ষা, সংঘাত ও ভবিষ্যৎ নির্মাণেরও ইতিহাস।


উপসংহার
বাংলা বিভাজন এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আজও গর্বের সহিত আলোচনার বিষয়। পূর্বের আটজন মুখ্যমন্ত্রী কেন পারলেন না এই সত্য ইতিহাস সামনে আনতে, পাঠকগণই প্রশ্নের উত্তর সামনে আনবেন।
ইতিহাসের উদ্দেশ্য কেবল অতীতের বিচার নয়— বর্তমানকে বোঝা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতন হওয়াও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই আজ মানুষ বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস ঘোষণার জন্য ধন্যবাদ কৃতজ্ঞতায় ভরিয়ে দেবে। আসুন, আমরা প্রজন্মর পর প্রজন্ম এই ইতিহাস যেন স্মরণ রাখি।

লেখক  ড. সুভাষ সরকার বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও ভারত সরকারের প্রাক্তন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। প্রতিবেদনটিতে মতামত লেখকের নিজস্ব এবং এবিপি লাইভ ও এবিপি আনন্দ কর্তৃক লিখিত নয়।

Disclaimer: This content is aggregated dynamically from public feeds distributed by ABP Ananda - Districts. It has not been created, edited, or verified by our team. View our full terms on the policy page.

Published Via: ABP Ananda - Districts

Read Previous

Weather Update: লাল সতর্কতা !...

Read Next

Rabindranath Chatterjee : 'মমতা...